কবি কাজী নজরুল ইসলাম হেমচন্দ্র কানুনগোকে “বিপ্লবীদের দ্রোণাচার্য” বলে অভিহিত করেছিলেন। তাঁর জীবন ও কর্ম আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। লিখেছেন- দেবাশীষ মণ্ডল
হেমচন্দ্র দাস কানুনগো (৪ আগস্ট, ১৮৭১ – ৮ এপ্রিল, ১৯৫১) ছিলেন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অনন্যসাধারণ ব্যক্তিত্ব। তিনি শুধু একজন বিপ্লবীই ছিলেন না, ছিলেন একজন মহান শিক্ষক এবং ভারতের জাতীয় পতাকার প্রথম রূপকার। কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁকে “বিপ্লবীদের দ্রোণাচার্য” বলে অভিহিত করেছিলেন। তাঁর জীবন ও কর্ম আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
প্রাথমিক জীবন ও বিপ্লবী কর্মকাণ্ড:
হেমচন্দ্র দাস কানুনগো অগ্নিযুগের সময় ভারতীয় বিপ্লবী আন্দোলনের এক অগ্রগামী নেতা ছিলেন। বিপ্লবের প্রাথমিক পর্যায়ে, উচ্চমানের বোমার অভাবে বিপ্লবীদের অনেক অভিযান ব্যর্থ হচ্ছিল। এই সমস্যার সমাধানে হেমচন্দ্র পৈত্রিক সম্পত্তি বিক্রি করে ১৩ আগস্ট, ১৯০৬ সালে প্যারিসে যাত্রা করেন বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ নিতে।
প্যারিস ও লন্ডনে বিপ্লবী কার্যক্রম:
প্যারিসে কিছুদিন কাজ করার পর, আর্থিক সংকটে পড়লে তিনি লন্ডনে চলে যান। সেখানে একজন প্রবাসী রত্ন ব্যবসায়ীর আর্থিক সহায়তায় একটি উচ্চমানের বোমা তৈরির রসায়নাগার স্থাপন করেন। তবে ব্রিটিশ গোয়েন্দা পুলিশের নজরে আসার পর, তিনি আবার প্যারিসে ফিরে আসেন এবং একজন ফরাসি কেমিস্টের কাছে “এক্সপ্লোসিভ কেমিস্ট্রি” শিখতে শুরু করেন।
ভারতের জাতীয় পতাকার রূপকার:
প্রবাসী ভারতীয় বিপ্লবী মাদাম কামার অনুরোধে, হেমচন্দ্র ভারতের প্রথম জাতীয় পতাকার রূপদান করেন। ১৯০৭ সালে জার্মানির স্টুয়ার্ট শহরে একটি আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক সভায় মাদাম কামা সেই পতাকাটি উত্তোলন করেন।
দেশে ফিরে বিপ্লবী কর্মকাণ্ড:
১৯০৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে, হেমচন্দ্র দেশে ফিরে আসেন এবং বোমা তৈরির কাজ শুরু করেন। তাঁর তৈরি প্রথম বোমাটি চন্দননগরের মেয়রের ওপর নিক্ষিপ্ত হয়েছিল, যদিও সেটি সফল হয়নি। এরপর প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডকে হত্যা করার জন্য দ্বিতীয় বোমাটি তৈরি করা হয়। যদিও এটি সফল না হলেও, পরবর্তী সময়ে ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকী সেই বোমা দিয়ে কিংসফোর্ডের ওপর হামলা করেন।
আলিপুর বোমা মামলা ও কারাবাস:
এই ঘটনার পর, ব্রিটিশ পুলিশ হেমচন্দ্রসহ অন্যান্য বিপ্লবীদের গ্রেপ্তার করে। আলিপুর বোমা মামলায় হেমচন্দ্রের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। তিনি এই মামলার একমাত্র আসামি ছিলেন যিনি পুলিশের কাছে কোনো স্বীকারোক্তি দেননি।
পরবর্তী জীবন:
১৯২৭ সালে জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর, হেমচন্দ্র সাহিত্যচর্চা, ছবি আঁকা এবং ফটোগ্রাফি নিয়ে সময় কাটাতেন। তাঁর রচিত দুটি গ্রন্থ, ‘বাংলায় বিপ্লব প্রচেষ্টা’ এবং ‘অনাগত সুদিনের তরে’, আজও পাঠকদের অনুপ্রাণিত করে।
মৃত্যু:
হেমচন্দ্র দাস কানুনগো ১৯৫১ সালের ৮ই এপ্রিল মেদিনীপুর হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর নিঃসঙ্গ জীবন এবং বিপ্লবী কর্মকাণ্ড আমাদের সকলের জন্য এক অনুপ্রেরণা।
উপসংহার:
হেমচন্দ্র দাস কানুনগো ছিলেন ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের এক নীরব নায়ক। তাঁর জীবন এবং কর্ম আমাদের জাতির জন্য একটি মূল্যবান উত্তরাধিকার। তাঁর স্মৃতির প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা চিরকাল অব্যাহত থাকবে।
তথ্যসূত্র:
১. The Bomb in Bengal – Peter Heehs
২. আনন্দবাজার পত্রিকা
৩. মাহিষ্য রত্নাবলী জীবনী শতক -দুলালকৃষ্ণ দাশ